Tuesday , September 26 2017
শিরোনাম
You are here: Home / জাতীয় / মাদকাসক্তের একটি বড় অংশই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী

মাদকাসক্তের একটি বড় অংশই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী

মাদকাসক্তের একটি বড় অংশই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী

ডিটেকটিভ নিউজ ডেস্ক

দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীদের মধ্যে অস্বাভাবিক হারে মাদকসেবীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, দেশে ৪০ লাখ মাদকাসক্ত রয়েছে। তার মধ্যে নারী মাদকাসক্তের সংখ্যা ৪ লাখ এবং ওসব মাদকাসক্তের একটি বড় অংশই উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। বর্তমানে দিন দিন মাদকের ভয়াল থাবা আরো ভয়াবহভাবে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, বিগত কয়েক বছরে এ হার বেড়েছে অস্বাভাবিকহারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষ বাহ্যিকভাবে মাদকের বিরুদ্ধে তাদের কঠোর অবস্থানের কথা বললেও কার্যত তা বন্ধে বিশেষ কোনো তৎপরতা দৃশ্যমান নয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত এক জরিপে তথ্যমতে প্রতিষ্ঠানটির অর্ধেক ছেলে এবং চার ভাগের একভাগ মেয়ে শিক্ষার্থীই ধূমপায়ী। আর নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে শতকরা ৬৬ ভাগই চারুকলা অনুষদের ছাত্রী। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) পরিচালিত এক জরিপ বলছে, দেশে মাদকাসক্তদের মধ্যে ২০ দশমিক ৬ শতাংশ নারী। আর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশের ৪০ লাখ মাদকাসক্ত রয়েছে। এসব মাদকদ্রব্য সেবন, বহন ও যোগানের সাথে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। যদিও ওই ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা বলা হচ্ছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসন মাদক সেবন, বহন ও কর্মকা-ের সাথে জড়িত সন্দেহে যাদের গ্রেপ্তার করেছে তাদের বেশির ভাগই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেই ভয়ংকর সব মাদকের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। পূর্বে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ছেলেরা মাদকের শিকার হলেও মেয়েদের তা গ্রহণ করতে তেমন দেখা যেত না। কিন্তু বিভিন্ন জরিপ দেখা যাচ্ছে গত কয়েক বছরে মাদক সেবনের মতো একটি আত্মঘাতী নেশার ছোবল থেকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নারী শিক্ষার্থীরাও পিছিয়ে নেই। তারাও ছেলেদের মতোই ভয়ংকর আকারে মাদকাসক্ত হয়ে উঠছে। সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা তাকে পুরো জাতির জন্য আত্মঘাতী এক প্রবণতা হিসেবে সতর্ক করছে। কিন্তু পরিস্থিতির উন্নয়নের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

সূত্র জানায়, গত মাসে দেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ জন ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজনকে ঢাবি ক্যাম্পাস থেকে হাতেনাতে ইয়াবা ও হিরোইনসহ গ্রেপ্তার করে শাহাবাগ থানা পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের রাজনীতির সাথে জড়িত বলে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জানানো হয়। মাদকসেবী গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক ছাত্র নেতা আটকদের থানা থেকে ছাড়াতে নানান তৎপরতা চালায়। তাছাড়া প্রায় প্রতি মাসেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল, ক্যাম্পাস ও একাডেমিক ভবনের বিভিন্ন কক্ষ থেকে মাদকাসক্ত অবস্থায় শিক্ষার্থীদের আটকের ঘটনা ঘটছে। বিভিন্ন হলের একাধিক রুমও মাদকের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, যেসব রুম থেকে এসব মাদকের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা হয় তা ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। ওসব রুমে নিয়মিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নয়, এমন বহিরাগতরাও যাতায়াত করে থাকে। মূলত বহিরাগত চক্রই বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদকের জোগান সরবরাহ করে থাকে। আর অর্থের লোভে ছাত্র সংগঠনের সাথে জড়িত ক্ষমতাসীন ছাত্ররাই তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে দেয়। এমনকি মাদক সেবনের সাথে জড়িত নয় এমন শিক্ষার্থীরাও অর্থের লোভে মাদক বহন ও বিতরণের সাথে যুক্ত হচ্ছে। আবার মাদকের দায়ে পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা পুলিশের কাছ থেকে আসামি ছিনিয়ে নেয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে ঢাবিতে। একইভাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অবস্থা আরও ভয়াবহ। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অংশ মাদকের গন্ধে ভরে ওঠে। মাদকসেবীদের একটি বড় অংশই বহিরাগত। কয়েকটি হলের নির্দিষ্ট রুম থেকে ওসব মাদকের সরবরাহ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বহিরাগত দুর্বৃত্তরা দিনের বেলায় নির্দিষ্ট ওইসব কক্ষে মাদক জমা করে। রাতে সেখান থেকে সরাসরি নেশার জন্য চলে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়টির মেয়েদের হলেও মাদকের সরবরাহ রয়েছে বলে জানা গেছে। ছুটির সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা থাকে সবচেয়ে নাজুক। ওই সময়ে বহিরাগতরা পুরো বিশ্ববিদ্যালয়টিকেই একটি মাদকের আখড়ায় পরিণত করে। আর এর সাথে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরই একটি অংশের যোগাযোগ। ওসব কর্মকা-ে অতিষ্ঠ সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছে, দেশের সবচেয়ে সুন্দর এ ক্যাম্পাসের এই একটি নেতিবাচক দিকের জন্য সুনাম ম্লান হচ্ছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে মাদকমুক্ত করার দাবিতে আন্দোলনও করেছে। কিন্তু কাজের কাজ হয়নি কিছুই।

সূত্র আরো জানায়, শুধু ঢাবি, জাবি, জবি বা বেরোবিই নয়, দেশের অন্যান্য সরকারি বেসরকারি অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েরই অবস্থা একই রকম। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। মাদকবিরোধী বিভিন্ন সংগঠনও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মরণঘাতী সব মাদকে জড়িত হওয়ার তথ্য দিচ্ছে। উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে আসা শিক্ষার্থীরা সিসা, ইয়াবা, হিরোইন ও ফেনসিডিল এবং অর্থিকভাবে নিম্ন ক্যাটাগরির শিক্ষার্থীরা গাঁজা ও বিভিন্ন ধরনের আঠাজাতীয় মাদকের শিকার হচ্ছে বেশি। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। মুখে বিভিন্ন সময়ে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বললেও বাস্তবিক অর্থে তার কোনো প্রয়োগ নেই।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে ক্যাম্পাসে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলে আসছে। কিন্তু সরেজামিনের চিত্র বলছে ক্যাম্পাস, হল ও বিভিন্ন প্রান্তে অনায়াসেই চলছে মরণঘাতী এ প্রবণতা। প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে এ কাজের সাথে যুক্তদের আটক করলেও ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় পরিচালিত হওয়ায় আইন আদালত তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে থানা থেকেই মাদকের সাথে যুক্তদের ছাড়িয়ে আনছে প্রভাবশালীরা। বিচার বা শাস্তি না হওয়ায় একাধিকবার আটক হয়েও এ কাজ থেকে বিরত থাকছে না দুষ্কৃতকারীরা। সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছে, এ অবস্থায় উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষাঙ্গনের বদলে মাদকের আখড়ায় পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা মাদকের সাথে জড়িয়ে পড়া প্রসঙ্গে ছাত্রলীগের সভাপতি মো. সাইফুর রহমান সোহাগ জানান, মাদকের বিষয়ে কাউকে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। মাদক সেবনকারী যত বড় নেতাই হোক তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। গত কিছুদিন আগে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের এক সমাবেশে ছাত্রলীগ সভাপতি সোহাগ মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘৭১-এ আমরা মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। আমরা দ্বিতীয় প্রজন্ম শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি। আমরা সবাই মিলে দেশকে মাদকমুক্ত করব।

এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি আবুল হোসেন জানান, ‘আমরা ক্যাম্পাসে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করি। এ সমস্যা বন্ধে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রান্তে সিসিটিভি বসিয়েছি।’

About admin

Comments are closed.

Scroll To Top