Tuesday , November 21 2017
শিরোনাম
You are here: Home / জাতীয় / উপকূলীয় অঞ্চলের কাঁকড়া দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম হাতিয়ার

উপকূলীয় অঞ্চলের কাঁকড়া দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম হাতিয়ার

উপকূলীয় অঞ্চলের কাঁকড়া দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম হাতিয়ার
খুলনা ব্যুরো
কাঁকড়া এখন হোয়াইট গোল্ড চিংড়ির পর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী অন্যতম খাত। গোটা উপকূল আর সুন্দরবনজুড়ে এর ব্যাপক যোগান। প্রাকৃতিকভাবে আহরণের পাশাপাশি কাঁকড়া এখন আধুনিকভাবে চাষাবাদ হচ্ছে। আর তাতেই বদলাচ্ছে কাঁকড়া চাষির ভাগ্য আর দেশে আসছে হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। সংশ্লিষ্ট বিভাগের পৃষ্ঠপোষকতায় সম্ভাবনাময় এই জলজ সম্পদ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে এটাও হতে পারে দারিদ্র বিমোচনের অন্যতম হাতিয়ার। স্বল্প জায়গায় বিজ্ঞানসম্মতভাবে কাঁকড়া চাষ এখন খুলনাঞ্চলের মডেল। বিদেশের বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলের চিংড়ি চাষিরা এখন চিংড়ির পাশাপাশি কাঁকড়া চাষে ঝুঁকেছে। উদ্যোক্তারা এখন অবহেলিত এই খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
সূত্রমতে, এখন কাঁকড়া মৌসুম চলছে। বৃহত্তর খুলনাঞ্চলের হাজার হাজার চিংড়ি ঘেরে প্রাকৃতিকভাবে কাঁকড়া চাষ করা হচ্ছে। সেই সাথে ঘেরের মাঝে নেট জাল দিয়ে এবং তার চারপাশে পানির ভেতর বাঁশের চটা দিয়ে পাটা তৈরি করে খাচার মধ্যে কাঁকড়া চাষ শুরু হয়েছে। গত ৫-৬ বছর লোকাল কাঁকড়ার হ্যাচারী নামে খ্যাত এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাঁকড়া চাষ প্রকল্প এ অঞ্চলের চাষীদের ব্যবসায় সফলতা নিয়ে এসেছে। বাণিজ্যিকভাবে খাঁচায় কাঁকড়া চাষ করে অনেকেই এখন স্বাবলম্বী। খুলনার বটিয়াঘাটার কাঁকড়া চাষি হরিদাস ম-ল গত ৩ বছরে কাঁকড়া চাষ করে প্রায় ১০ লাখ টাকা উপার্জন করেছে। তিনি গাওঘারা গ্রামে আধা পাঁকা টিনের বাড়ি নির্মান করেছেন। ঘুরে দাড়িয়েছে তার দারিদ্র্যের অভিশপ্ত জীবন। একইভাবে কাঁকড়া চাষ করে জীবনযুদ্ধে সফলতা অর্জন করেছে হালিয়া গ্রামের কমলেশ বালা, নোয়াইল তলার জাকির, সুরখালীর আসাফুর মাস্টার, কয়রার কামাল শেখ, পাইকগাছার নরেশ ম-ল প্রমুখ। এদিকে সুন্দরবনের শত শত নালা ও খালে এবং সমুদ্র জলসীমা ও মোহনায় প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত কাঁকড়া আহরণ চলছে। তবে গত বছর জলদস্যুদের উৎপাতে অন্যান্য বছরের তুলনায় কম কাঁকড়া আহরিত হয়। কিন্তু এ বছর এর ব্যাপক সম্ভাবনার কথা বলেছেন কাঁকড়া আহরণকারীরা, বনবিভাগ ও প্রাণিসম্পদ অধিদফতর। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ, আধুনিক পদ্ধতি ও আহরণকারীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাবে সরকার প্রতি বছর এখাত থেকে কয়েকশ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তবে প্রাকৃতিকভাবে কাঁকড়া আহরনের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ঘেরে ও পুকুরে কাঁকড়া উৎপাদন করে অনেকেই সফলতা পেয়েছেন।
সংশ্লি¬ষ্ট সূত্র জানায়, প্রতি বছর আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁকড়ার চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি দামও বাড়ছে। কিন্তু হ্রাস পাচ্ছে এর উৎপাদন। কাঁকড়া আহরণ মৌসুমে উপকূলীয় এলাকায় সহস্রাধিক জেলে সুন্দরবনের বিভিন্ন স্টেশন হতে পাস সংগ্রহ করে গভীর বনে যায় কাঁকড়া আহরণের জন্য। রাজস্ব দিতে হয় জনপ্রতি নৌকাসহ ৩/৫ টাকা। গভীর সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্টসহ সমুদ্র পর্যন্ত তারা কাঁকড়া আহরণ করেন। কাঁকড়া আহরণকারীরা জানান, জলদস্যুদের উৎপাত না থাকায় এবার সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরা জেলেদের আগমন বেশি হতে পারে। এছাড়া উপকূলীয় জেলা খুলনা বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা চিংড়ি ঘেরগুলোতে প্রাকৃতিকভাবেই কাঁকড়া উৎপাদিত হচ্ছে। সংশ্লি¬ষ্টদের মতে সরকারি পষ্ঠপোষকতা পেলে কাঁকড়া রফতানি করে আরো বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। জানা গেছে, স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি কাঁকড়ার দাম গ্রেডভেদে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, আমাদের দেশে ১৫ প্রজাতির কাঁকড়া রয়েছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে সিলা সেটরা (শিলা কাঁকড়া) কাঁকড়ার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এই কাঁকড়া সুন্দরবনে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত যে কাঁকড়া ধরা পড়ে তা সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে রফতানি এবং সরকারিভাবে ব্যাংক ঋণের সুবিধা দেয়া হলে উপকূলীয় জেলা ছাড়াও দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে কাঁকড়া রফতানি বিরাট সাফল্য বয়ে আনবে।
মৎস্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, আশির দশকের শুরুতে প্রথম অপ্রচলিত পণ্য হিসেবে কাঁকড়া বিদেশে রফতানি শুরু হয়। রফতানি ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরে বিদেশে প্রথম কাঁকড়া রফতানি করা হয়। এরপর রফতানি বন্ধ থাকে প্রায় ৩ বছর। ১৯৮২-৮৩ অর্থবছরে আবার বিদেশে রফতানি করা হয়। পর্যায়ক্রমে আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা বাড়তে থাকে। পাশাপাশি বাড়তে থাকে এখাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় আয়। ১৯৯০-৯১ সালে কাঁকড়া রফতানি করে আয় হয় ২৭ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। এরপর ২০০১-০২ অর্থ বছরের এ খাত থেকে আয় হয় প্রায় ৫৩ মিলিয়ন টাকা। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এই আয় গিয়ে দাঁড়ায় ২৫০ মিলিয়ন টাকায়।
কাঁকড়া আহরণের সবচেয়ে বড় ভা-ার সুন্দরবন। এখানে কাঁকড়া আহরণকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবার বন বিভাগ ব্যাপকভাবে টহল জোরদার করেছে। সিএফ আমির হোসাইন বলেন, কাঁকড়া আহরণের বিষয়ে  ইতোমধ্যে বন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরকে দায়িত্ব পালনের জন্য বিশেষভাবে সর্তক করা হয়েছে। সম্ভাবনাময় এই শিল্পকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া ও এর সাথে জড়িত তৃণমূল পর্যায়ের শত শত কাঁকড়া আহরণকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি কোনো রকম হয়রানি যেন না হয় সে বিষয়ে সজাগ করা হয়েছে।

About admin

Comments are closed.

Scroll To Top